মিরপুরে পঁচে গলে থাকা মায়ের এক ছেলে। দেখে বুঝার উপায় নেই।এক ছেলে সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক, আরেক ছেলে কানাডায় স্থায়ী


নাতি-নাতনিরা নামী স্কুল-কলেজে পড়ে।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, কী ভাগ্যবতী মা! কী সফল সন্তান! কী গর্বের পরিবার!
রত্নগর্ভা মা… তাই না?
ওয়েট! একটু থামুন।
এই সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে কত রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন এই মা, তা কি কেউ জানে?
যখন সন্তানের জ্বর ১০৪ ডিগ্রি ছিল, তখন তিনিই রাতভর মাথায় পানি ঢেলেছেন।
যখন স্কুলের ফি দেওয়ার টাকা ছিল না, তখন নিজের শখ, নিজের প্রয়োজন, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন।
যখন সন্তান পরীক্ষার হলে বসেছিল, তখন বাইরে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে করতে চোখের পানি ফেলেছেন।
নিজে পুরোনো শাড়ি পরে থেকেছেন, কিন্তু সন্তানের বই যেন না কমে সেদিকে খেয়াল রেখেছেন।
একদিন সন্তানরা বড় হয়েছে।
অনেক বড়।
এত বড় যে মায়ের জন্য আর সময় হয়নি।
এত বড় যে মায়ের ফোন ধরাও কখনো কখনো বিরক্তিকর মনে হয়েছে।
এত বড় যে “কেমন আছো মা?” এই প্রশ্নটুকুও করার প্রয়োজন বোধ করেনি।
আর সেই মায়ের শেষ পরিণতি?
মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে একা পড়ে ছিলেন তিনি।
একদিন নয়।
দুইদিন নয়।
১০-১৫ দিন।
মৃত্যুর পরও কেউ খোঁজ নেয়নি।
কেউ দরজায় কড়া নাড়েনি।
কেউ ফোন করেনি।
কেউ বুঝতেও পারেনি যে যিনি একদিন তিনটি সন্তানকে বুকের রক্ত পানি করে মানুষ করেছিলেন, তিনি আর বেঁচে নেই।
অবশেষে দুর্গন্ধ বের হলে প্রতিবেশীরা ৯৯৯-এ ফোন দেয়।
পুলিশ এসে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে তাঁর মরদেহ।
ভাবুন তো…
যে মা সন্তানের কান্না শুনে রাতের ঘুম ছেড়ে দিতেন, সেই মায়ের মৃত্যুর খবরও সন্তানদের কানে পৌঁছায়নি দিনের পর দিন!
এমন জীবনের পেছনেই কি আমরা ছুটছি?
সন্তানকে শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সচিব, প্রফেসর বানাচ্ছেন…
নাকি মানুষও বানাচ্ছেন?
কারণ ডিগ্রি মানুষকে শিক্ষিত বানায়, কিন্তু মানবিক বানায় না।
আজ যে মা-বাবা সন্তানের জন্য জীবন বিলিয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের শেষ বয়সের নিশ্চয়তা কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নয়, কোনো বিদেশি পাসপোর্ট নয়, কোনো বড় চাকরিও নয়।
তাঁদের শেষ আশ্রয় একজন মানবিক সন্তান।
প্রশ্নটা নিজের কাছে রাখুন…
আপনার সন্তান কি শুধু সফল হচ্ছে, নাকি মানুষও হচ্ছে?ফ্ল্যাটে মায়ের মৃত্যু- ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার পথে হাটছে সবাই।
জানা গেল যুগ্ম সচিব ও বুয়েট শিক্ষক ছেলের নাম-পরিচয়
যুগ্ম সচিব ড. একে এম আনিসুর রহমান ও বুয়েট শিক্ষক ড. এ কে এম আশিকুর রহমান
যুগ্ম সচিব ড. একে এম আনিসুর রহমান ও বুয়েট শিক্ষক ড. এ কে এম আশিকুর রহমান © মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বুয়েট ওয়েবসাইট
রাজধানীর পল্লবীতে একটি বাসা থেকে এক বৃদ্ধার পচা-গলা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আনুমানিক ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলায় মেয়ের বাসার একটি কক্ষে দীর্ঘদিন ধরে নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করে আসছিলেন। গতকাল রবিবার (১ জুন) রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ কল পেয়ে পল্লবী ৬ নম্বর সেকশনের ৮ নম্বর সড়কের ওই বাসা থেকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করেছে
পুলিশ জানিয়েছে, বাসাটি ওই বৃদ্ধার মেয়ের। তার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, যিনি বছর পাঁচেক আগে মারা গেছেন। মৃতের এক ছেলে যুগ্ম সচিব এবং আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের শিক্ষক। তারা পরিবারসহ অন্যত্র থাকতেন। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বুয়েটের শিক্ষক সন্তান এলেও যুগ্ম সচিব ছেলে আসেননি।
এ ঘটনা গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে আজ সোমবার (২ জুন) রাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান সামি এই দুই ছেলের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেছেন।
সামির দেওয়া তথ্য মতে, নূরজাহান বেগমের বড় ছেলের নাম ড. এ কে এম আনিসুর রহমান, তিনি সরকারের যুগ্মসচিব পদে কর্মরত রয়েছেন বর্তমানে তার কর্মস্থল মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের একজন অধ্যাপক।
সামি তাদের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, নূরজাহান বেগমের বড় ছেলে ড. একে এম আনিসুর রহমান বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব পদে কর্মরত রয়েছেন, বর্তমানে তার কর্মস্থল মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। তিনি ১৯৮৬ সালে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় হতে এসএসসি ও ১৯৮৮ সালে ঢাকা কলেজ হতে এইচএসসি পাস করেন (প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ), পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক করেন (প্রথম বিভাগ, ১৯৯৫ সাল)।
সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর পরিকল্পনা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি লেখেন, এই কর্মকর্তার মা সম্পূর্ণ অবহেলিতভাবে মারা গেলেও, তিনি নিজে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে ৫০০ শয‍্যায় উন্নীত করার প্রকল্পের উপ পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। যুগ্মসচিব ড.একে এম আনিসুর রহমান, দক্ষিণ কোরিয়ার কেডিআই স্কুল অফ পাবলিক পলিসি এন্ড ম‍্যানেজম‍্যান্ট হতে এমপিপি ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
নূরজাহান বেগমের দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের একজন অধ্যাপক ও বেসরকারি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি।
সামি আরও উল্লেখ করেন, তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ৩২ ব্যাচের একজন প্রাক্তন ক্যাডেট, এসএসসি (১৯৮৯), এইচএসসি (১৯৯১) তে সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ও ২০০১ সালে এমএসসি সম্পন্ন করেন। তার রয়েছে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে কম্পিউটিং সায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রি।
নূরজাহান বেগমের কন্যা ফাতিমা নাসরিন সুলতানা, যিনি মিরপুরের ইম্পেরিয়াল স্কুলের শিক্ষিকা, আরেক ছেলে কে এম আতিকুর রহমান বর্তমানে কানাডা প্রবাসী, তার বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে বলে পোস্টে তিনি জানান
মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে যখন পুলিশ ঢুকলো, তখন পুরো ঘরজুড়ে ছিল শুধু পচনের গন্ধ আর ভয়ংকর নীরবতা। বিছানায় পড়ে ছিলেন ৭২ বছরের এক মা। কয়েকদিন আগেই মৃ*ত্যু হয়েছে তাঁর। অথচ কেউ জানেনি, কেউ খোঁজও নেয়নি।
সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা হলো — এই বৃদ্ধা একা থাকতেন না। তাঁর পাশের ঘরেই থাকতেন তাঁর নিজের মেয়ে। একই ছাদের নিচে থেকেও দিনের পর দিন মা’র ঘরে উঁকি দিয়ে দেখারও সময় হয়নি। আর ছেলেরা সবাই জীবনে প্রতিষ্ঠিত — কেউ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে স্থায়ী। জীবনে সফলতার সব পরিচয় ছিল, শুধু একটা পরিচয় হারিয়ে গিয়েছিল — “মানুষ” হওয়ার পরিচয়।
যে মা নিজের সুখ ত্যাগ করে সন্তানকে বড় করেছেন, রাত জেগে পড়িয়েছেন, নিজের প্রয়োজন ভুলে সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করেছেন, সেই মা জীবনের শেষ সময়ে পড়ে ছিলেন অন্ধকার, অপরিষ্কার একটা ঘরে।
আজকাল আমরা সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কর্মকর্তা বানাতে ব্যস্ত। কিন্তু মানবিক মানুষ বানানোর শিক্ষা দিতে ভুলে যাচ্ছি। অথচ শেষ পর্যন্ত মানুষের পরিচয় পদবি দিয়ে নয়, আচরণ দিয়েই হয়।
এই ঘটনাটা শুধু একটা খবর না, এটা আমাদের সমাজের আয়না। যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মা ধীরে ধীরে একা হয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের জন্য আলাদা একটা ঘর থাকে, হয়তো মাস শেষে কিছু টাকা থাকে, কিন্তু সময় থাকে না, মায়া থাকে না, পাশে বসে “কেমন আছো?” জিজ্ঞেস করার মানুষ থাকে না।
মনে রাখবেন, মা-বাবা কখনো বোঝা না। তারা আমাদের জীবনের সেই মানুষ, যাদের ছাড়া আমাদের অস্তিত্বই হতো না।
তাই আজ ব্যস্ততার মাঝেও একবার মায়ের ঘরে যান। বাবার পাশে বসুন। হাতটা ধরে জিজ্ঞেস করুন, “ভালো আছো তো?”