কম বয়সে কিডনি নষ্ট করার পেছনে আসল খলনায়ক কারা? জেনে নিন

আজকে একটু সিরিয়াস একটা বিষয় নিয়ে কথা বলি, যেটা আমাদের চারপাশে ইদানীং খুব বেশি হচ্ছে। একটু সময় নিয়ে পড়বেন প্লিজ, হয়তো আপনার বা আপনার পরিবারের কারো জীবন বেঁচে যেতে পারে।

​কয়েকদিন আগের একটা ঘটনা। ২৬ বছরের একটা ছেলে, কোনো রিচ ফুড খায় না, ধুমপানের অভ্যাস নেই, প্রতিদিন মাঠে ফুটবল খেলে। স্রেফ কয়েকদিন ধরে একটু শরীর ম্যাজম্যাজ করছিল আর সকালে ব্রাশ করার সময় বমি ভাব হতো। সাধারণ গ্যাস্ট্রিক ভেবে ডাক্তার দেখাতে গেল। ডাক্তার নরমাল কিছু টেস্ট দিলেন। ব্লাড রিপোর্ট আসার পর দেখা গেল তার ক্রিয়েটিনিন (Creatinine) আকাশচুম্বী! ডাক্তার সরাসরি বললেন, তার দুটো কিডনিই অলমোস্ট ড্যামেজ (CKD Stage 5)।

​আরেক ভদ্রলোক, ৪৫ বছর বয়স, ব্যাংকে চাকরি করেন। লাইফে কোনোদিন একটা প্যারাসিটামলও অহেতুক খাননি। অফিসের বাৎসরিক ফ্রি মেডিকেল চেকে গিয়ে দেখেন তারও একই অবস্থা। ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, “আগে কখনো খারাপ লাগেনি?” উনি অবাক হয়ে বললেন, “না স্যার! আমি তো একদম ফিট, কোনোদিন তো কিচ্ছু টের পাইনি!”

​বয়স বা ব্যাকগ্রাউন্ড আলাদা হলেও গল্পটা কিন্তু এক। কোনো রকম আগাম ওয়ার্নিং বা লক্ষণ ছাড়াই হুট করে কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া।
​কিন্তু ভাই, কোনো লক্ষণ ছাড়া একটা অঙ্গ কীভাবে নষ্ট হয়?

​এখানেই লুকিয়ে আছে আসল ট্র্যাজেডি।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, আমাদের দুটো কিডনিতে প্রায় ২০ লাখের মতো ছোট ছোট ছাঁকনি (নেফ্রন) থাকে। কিডনির একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে—এর একটা বড় অংশ যদি ড্যামেজও হয়ে যায়, বাকি অংশটা জানপ্রাণ দিয়ে ওভারটাইম কাজ করে শরীরের ব্যালেন্স ঠিক রাখে।

​সহজ করে বুঝাই। ধরেন, একটা অফিসের ১০ জনের কাজ যদি ৫ জন মিলে টেনেটুনে সামলে নেয়, বাইরে থেকে দেখে কিন্তু মনে হবে অফিস দারুণ চলছে। কিডনিও ঠিক এই কাজটাই করে। ফলে দেখা যায় কিডনির কার্যক্ষমতা ৫০-৬০% কমে গেলেও ব্লাড রিপোর্টে ক্রিয়েটিনিন নরমাল আসে। কিন্তু যখন সুস্থ ছাঁকনিগুলো আর লোড নিতে পারে না এবং কার্যক্ষমতা ১৫-২০% এর নিচে নেমে যায়, তখনই হুট করে একদিন শরীর ভেঙে পড়ে। আর ততদিনে ক্ষতিটা এমন জায়গায় চলে যায় যে, সেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হয় না (Irreversible)।

​তাহলে এই কম বয়সে কিডনি নষ্ট করার পেছনে আসল খলনায়ক কারা?
​১. মুড়ি-মুড়কির মতো পেইনকিলার খাওয়া: আমাদের একটা খুব বাজে অভ্যাস আছে—একটু মাথা ব্যথা বা পিঠ ব্যথা হলেই ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে পেইনকিলার (যেমন- ডাইক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন) কিনে খেয়ে ফেলি। সাথে বছরের পর বছর ধরে অহেতুক ডক্টরের প্রেসক্রিপশন ছাড়া গ্যাস্ট্রিকের ক্যাপসুল খাওয়া। এই অভ্যাসগুলো কিডনিকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়।

২. লুকানো প্রেশার বা ডায়াবেটিস: অনেকেই জানেনই না যে তাদের হাই প্রেশার বা ব্লাড সুগার আছে, কারণ তারা কখনো টেস্টই করাননি। এই রোগগুলো সাইলেন্টলি কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোকে ড্যামেজ করে দেয়।

৩. রাস্তার ধারের জাদুকরী ওষুধ বা ভেজাল টনিক: ফুটপাতে বা অলিতে গলিতে বিক্রি হওয়া তথাকথিত “যৌন শক্তিবর্ধক”, “হাঁপানি বা বাতের ব্যথার জাদুকরী হালুয়া/ট্যাবলেট”। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর স্টেরয়েড আর ভারী ধাতু (যেমন সীসা বা পারদ) মেশানো থাকে, যা কিডনিকে নিমেষেই ধ্বংস করে দেয়।

​একদম শেষ মুহূর্তে যে লক্ষণগুলো দেখা দেয় (যা আসলে অনেক দেরিতে আসে):
​হাত, পা বা মুখ ফুলে যাওয়া (শরীরে পানি জমা)।
​সবসময় চরম ক্লান্তি লাগা, অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠা।
​প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া বা প্রস্রাবের পরিমাণ হুট করে কমে যাওয়া।

​ত্বক অতিরিক্ত খসখসে হয়ে যাওয়া এবং তীব্র চুলকানি।

​ভয় দেখানোর জন্য লিখিনি, সমাধান কিন্তু খুব সহজ!
​সবচেয়ে স্বস্তির কথা হলো, এই কিডনি রোগ বা CKD যদি একদম শুরুর দিকে (Stage 1 বা 2 তে) ধরা পড়ে, তবে কোনো ডায়ালাইসিস বা ট্রান্সপ্ল্যান্ট লাগে না। সামান্য কিছু ওষুধ আর লাইফস্টাইল ও ডায়েট কন্ট্রোল করেই বাকি জীবন একদম সুস্থভাবে পার করে দেওয়া যায়।

​তাহলে আমাদের এখন থেকেই কী করা উচিত?

​আপনার বয়স যদি ৩০ পার হয়ে থাকে, কিংবা পরিবারে যদি ডায়াবেটিস বা হাই প্রেশারের হিস্ট্রি থাকে—তবে বছরে অন্তত একবার Serum Creatinine (সাথে eGFR) এবং Urine R/M/E টেস্টটা করিয়ে নিন। খরচ খুবই সামান্য, কিন্তু এই একটা অভ্যাস আপনাকে অনেক বড় বিপদ থেকে বাঁচাবে।

​ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ভুলেও ফার্মেসি থেকে নিজের ইচ্ছামতো পেইনকিলার খাওয়া আজই বন্ধ করুন।
​সারাদিনে শরীর অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস করুন।

​আমাদের দেশে এই সামান্য সচেতনতার বড়ই অভাব।

নিজের অজান্তেই যেন বড় কোনো ক্ষতি না হয়ে যায়, তাই নিজে সচেতন হোন আর পোস্টটি শেয়ার করে আপনার বন্ধুদেরও একটু সতর্ক করে দিন।

​আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থ রাখুন, হেফাজতে রাখুন। আমিন।