প্রতিদিনের মতো সেদিন সকালেও জীবিকার তাগিদে কাজে বেরিয়েছিলেন তিনি। তখনও কি তিনি জানতেন, কয়েক ঘণ্টা পর ফিরে এসে তাকে দেখতে হবে মা আর তিন বোনের নিথর দেহ! যে ঘর প্রতিদিন মায়ের মমতা মাখা ডাক, বোনদের খুনসুটি আর ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্নে মুখর থাকত, সেই ঘর এখন কেবল গভীর নীরবতা আর অন্তহীন কান্নার সাক্ষী।
সিফাতের জীবনের লড়াইটা শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০১৯ সালের এক বৃষ্টিভেজা দিনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান তার বাবা কামাল হোসেন। হাড়ি-পাতিল ও সিলভারের সামগ্রী ফেরি করে অভাবের সংসার টেনে নিতেন তিনি। বাবার অকাল প্রয়াণে পুরো পরিবারটি ভেঙে পড়লেও হাল ছাড়েননি মা শাহিনুর বেগম। একমাত্র ছেলে আর তিন মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্নে তিনি প্রতিদিন কঠোর সংগ্রাম করেছেন। অভাব-অনটন থাকলেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে কোনো কার্পণ্য করেননি তিনি। বড় দুই সন্তানও মায়ের কষ্টের ভাগ নিতে ছোটখাটো কাজে যোগ দিয়েছিল।
সব প্রতিকূলতা জয় করে পরিবারটি যখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই নেমে আসে এই পৈশাচিক অন্ধকার। গত ২৫শে জুন, বৃহস্পতিবার সকালে এক ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মুহূর্তেই রঞ্জকে ভেসে যায় তাদের তিল তিল করে গড়া স্বপ্ন। নির্মম এই ঘটনার শিকার হন সিফাতের ৩৮ বছর বয়সী মা শাহিনুর বেগম, ২১ বছর বয়সী বড় বোন সায়মা আক্তার, ১৭ বছর বয়সী মেজো বোন ইকরা আক্তার এবং মাত্র ৯ বছরের ছোট বোন শিফা আক্তার।
এই ঘটনায় অভিযুক্ত ২৭ বছর বয়সী অন্তর মজুমদার পরবর্তীকালে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে প্রাণ হারায়। প্রয়াতদের মধ্যে সায়মা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ইকরা ছিলেন রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। লক্ষ্মীপুর রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সিফাত এখন আক্ষরিক অর্থেই একা। বাবা-মা কিংবা তিন বোন, আপন সম্পর্কের কেউই আর অবশিষ্ট নেই তার। চোখের পলকে পুরো পরিবার হারিয়ে এই কিশোর এখন প্রায় নির্বাক। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সে কেবল একটি উত্তরই খুঁজছে—কী অপরাধ ছিল তার মা আর বোনদের? কেন তাদেরকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো?
সিফাতের বন্ধুরা জানান, এই ভাই-বোনেরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। অভাব থাকলেও পড়াশোনার প্রতি তাদের প্রবল আগ্রহ ছিল। তালের বাবা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন, কিন্তু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার প্রাণহানি পরিবারটিকে বড় ধাক্কা দেয়। লক্ষ্মীপুর বা কুমিল্লায় তাদের দেখার মতো আর কেউ অবশিষ্ট নেই। একটি সাজানো-গোছানো পরিবার এখন পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
রায়পুর বাজার বণিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো যায়, সিফাত তাদের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মাসিক ৮ হাজার টাকা বেতনে কাজ শুরু করেছিলেন মাস সাতেক আগে। সবার সহযোগিতায় তাদের পরিবারটি বেশ ভালোভাবে চলছিল। কিন্তু এমন আকস্মিক ও বর্বরোচিত ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনার পর লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তদন্ত থেকে জানা যায়, শাহিনুর বেগম সন্তানদের নিয়ে ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। ঘাতক অন্তর মজুমদারও আগে ওই একই ভবনে ভাড়াটিয়া হিসেবে দেড় বছর বসবাস করেছিল। প্রায় সাত-আট মাস আগে সে বাসাটি ছেড়ে দেয়। পূর্ব পরিচিত হওয়ার সুযোগ নিয়ে এবং পানির পাইপ মেরামতের অজুহাতে সে সেদিন সকালে ওই বাসায় প্রবেশ করে। রানি নামের এক প্রতিবেশী তাকে বাসায় ঢুকতে দেখে সন্দেহ করেন এবং কলাপসিবল গেট আটকে স্থানীয়দের খবর দেন। তিনি এমন সাহসী পদক্ষেপ না নিলে হয়তো এই ভয়াবহ ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো না।